Archive for October, 2013

প্রবাসী বিভ্রম…

দেশের মাটির টান যে কত গভীর হয় তা শিখেছি ছোটবেলাতেই, কিন্তু অনুধাবন করেছি বিদেশে পাড়ি জমানোর পর। বলা হয় আজ কাল ছেলে মেয়ে আলাদা বলে কিছু নেই, কিন্তু সেই তত্ত্বের বাস্তবতা হাড়গম্য হয় যখন একান্নবর্তী পরিবারের ছত্রছায়ায় হয় বেড়ে ওঠা। বংশের বড় সন্তান হয়ে জন্ম নেয়াতে যেমন আনন্দ তেমনি তার কষ্ট মুখের কোনায় এক চিলতে মেকী হাসি রেখে সবকিছুতে “না ঠিক আছে” বলতে শিখে নিয়ে নিজের ইচ্ছের গলায় হাজার ছুরি চালিয়ে তবেই উপলব্ধি করতে হয়! কিন্তু এসব কথা যাক ছাইয়ের গাঁদায়, আমি যা বলছিলাম তা হল দেশের মাটির টান, সে কথাতেই ফিরি… প্রবাসে পদার্পণ করে যখন পুনঃরায় ছাত্রবেশ ধারন করেছি তারপর থেকে অনেক কিছুর পুনরাবৃত্তিও করতে বাধ্য হয়েছি, তার সাথে নানান ভাবে কথা বলার আর নিজেকে উপস্থাপন করার ঢং গুলোও আরও বেশ আড়ম্বরের সাথেই আয়ত্ত করেছি। আর যেই মুহূর্তে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি দেশে বেড়াতে গিয়ে ঢং গুলোকে কিভাবে প্রকাশ করলে তা দেখে সাবাই গদগদ হয়ে কেবল আমাকেই আহ্লাদ আর আহ্লাদ করবে, ঠিক সেই মুহূর্তে বাঁধ সাধল চীনের ইতিহাস! আর তখন থেকেই মনের ভিতর সেই যে ছটফটানি শুরু হয়েছে আজ তাই পণ করেই বসলাম এর অবসান ডেকে তবেই ঘুমোতে যাব!

চীনের ইতিহাস ব্যাখ্যা করলে সবাই যে ক্লান্তিতে নিদ্রাকোলে ঢলে পড়বেন তা আমি বলছিনা, কিন্তু কারো কারো ধৈর্যের যে মতিভ্রম হবেনা তেমনটির নিশ্চয়তা দেয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। তবে সেই ইতিহাসের মূল কথা হল কোন এক বিশ্বযুদ্ধের (যদিও বা তা দ্বিতীয়) পূর্ববর্তী সময়কালে যখন চীন বেশ কিছু কাল জাপানের কাছে জিম্মি ছিল তখন তার শিকড় হিসেবে জাপান বেঁছে নিয়েছিল চীনের অর্থনৈতিক দুরাবস্থা সাথে শিক্ষাগত অজ্ঞতাকে। আর সে কারনেই জাপানের বিরুদ্ধে তেমন কোন পদক্ষেপ নিতে চীনের সাহসের কানে ডঙ্কা বাজেনি, বাজেনি বুকে কোন দামামাও। এরপর জাপানের মাত্রাতিরিক্তও অহঙ্কার অথবা গোঁড়ামি কিংবা ভাঁড়ামির কারনেই হোক আর অন্য কারনেই হোক জাপান চীনকে উপহার দিয়ে বসল কিছু পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ। খানিকটা সেই উপহারের সুবাদেই চীনের সেই যে মতিভ্রম হল আর তারই সুফল স্বরূপ যে সেবারের বিশ্বযুদ্ধ তা খুব কম মানুষেরই হয়ত অজানা। এরপর জাপানকে বিতাড়িত করেই চীন যদি ক্লান্ত হয় তবে আজ বিশ্ববাজারে এশিয়ার বাণিজ্যে যে বাংলাদেশের ভাগ্য শীর্ষের শ্রেণীতে থাকে সে দুঃস্বপ্নের কথা বলে বিপদের লাল পতাকা কপালে স্বেচ্ছায় তুলে নিতে আমি রাজি নই। সে যাকগে, যে কথা বলতে এসেছি তা বলাই বাহুল্য…! চীন এর পরে হাতে পেল তাদের শূন্যতার মূল ছবক। আর সে ছবক বুঝে নেয়া মাত্রই চীনের সরকার উঠে পড়ে লেগে গেলেন সেই ছবকের দফারফা করে চীনকে শূন্য থেকে পূর্ণ করায়। সেই তত্ত্ব চীনা সরকার সহ সেই পুরো অশিক্ষিত অজ্ঞ জাতীও সেদিন বুঝে গেলেন, তত্ত্বটি ছিল কিছুটা এরকম—যদি চীনের জনগোষ্ঠী এভাবে অশিক্ষিতই থাকে তবে কেবল জাপান কেন, পুরো দুনিয়া শুদ্ধ খুজলেও একদিন হয়ত কোন একটি কীট মিলবেনা যা চীনের অস্তিত্ব প্রমাণে সাক্ষী বহন করে। চীনের সরাকার তাই যত সম্বল ছিল তার সব এক করে তা দিয়েই লেগে গেলেন সেই দেশের জনগোষ্ঠীর ভিতরে আধুনিকতার সব আলো জ্বেলে দিয়ে শুন্য কোঠা পূর্ণ করার কারিগর হয়ে। শুরু হল চীনা সমাজে শিক্ষার চিরুনি অভিযান। চীনের সমস্ত তরুন মেধাবী একত্র করে দল বানিয়ে সেই দলকে পাঠালেন সমস্ত বিশ্ব ঘুরে তন্নতন্ন করে সব শিক্ষা খুঁজে আনার নির্দেশ দিয়ে, লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে গ্রহন করতে বাদ রাখলেন না জাপানের শিক্ষাও। আর সেসব অজ্ঞ, নিরক্ষর, কাণ্ডজ্ঞানহীন তরুন সমাজও কম যায় না, কোন দাঙ্গা না করেই পথ অনুসরণ করলেন তাদের মহান নেতার, কোন রকম অভিযোগ করা ছাড়াই চীনের তরুন দল সেই বিশ্বাসঘাতী জাপান সহ পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিনি শিক্ষার শব ব্যাবচ্ছেদ করে নিয়ে এনে সেই যে নিজের ঘরে গিয়ে প্রবেশ করে আলো জ্বালাতে শুরু করলেন তারপর তার বিরতি কোথায় তা প্রত্নতত্তের বিষয় বলেই আমি গণ্য করছি। আজ সমস্ত চীন ছড়িয়ে সেই আলো পুরো দুনিয়া ছেয়ে বসার পরেও চীনের কারিগর সমাজ কতমাত্র ত্রিপ্ততা পেয়েছেন সে কথা বলা দুষ্কর। তখন থেকে কেবল চীনের প্রতিটা ঘরে কারিগর সমাজ পশ্চিমা দেশের আদলে জাপানি সংস্কৃতির মিশ্রণে সারা বিশ্বের প্রজন্মের চাহিদা অনুযায়ী রকম রকম আলোর সংকরীকরণ করেই চলেছেন, করেই চলেছেন। আর আমরা বাঙ্গালী, ৫২-৭১ অব্দি ৩০ লক্ষ মানুষের রক্ত মাড়িয়েও এখনো বর্বর। আজও হাজারে হাজার মানুষ কীটপতঙ্গের মত রাস্তায় সস্তা চায়ের লোভে মারা যায়! আমাদের দেশের তরুন সমাজ কেবল দেশ ছাড়ার স্বপ্নে বাঁচে, আর একবার সেই স্বপ্ন যদি পূরণ হয় তবে তার দেখা পাওয়া আমাবস্যায় চাঁদের চেয়েও দুষ্কর! তারা কেন নিজের দেশ ছেড়ে অন্যের মাটিতে তৃতীয় শ্রেণির প্রাণী হয়ে আরামে জীবন কাটানোর স্বপ্নে মশগুল তা আর আজ গোলকধাঁধা নয়। এত বছর পার হবার পর আমিই বা দ্বিধান্বিত কেন দেশের প্রতি ভালবাসা নিয়ে সেই প্রশ্নের উত্তরই বা দেবে এমন সাধ্য কার! কিন্তু তবুও বুক বাঁধি, এখনো তবু আশা জাগে যেই উন্মাদনা নিয়ে বাঙ্গালীর জন্ম হয়েছিল, যেই স্বপ্ন নিয়ে বদ্বীপে বাংলাদেশ নাম লিখিয়েছিল সেই স্বপ্ন যদি কখনো পূরণ হয়! আবার যদি বাঙালি দামাল হয়, আর চীনের ইতিহাস যদি……

থাক পড়ে সে কথা, চোখে বড্ড বেশি ব্যথা ধরেছে আজ!!!